Custom Search

Monday, October 10, 2016

গ্রাম চাচি

মা মারা যাবার পর, এলাকার এক চাচী ফোন দিলো। এমন ভাবে হড়বড় করে কথা বলা শুরু করলো! প্রতিটা বাক্যের শেষে একবার "বুচ্ছনি বাবা" বলেবলে কথা। অথচ তার চেহারাও মনে করতে পারলাম না। শৈশবে হয়ত দুই একবার দেখে থাকবো। মাতৃ শোকে তখন আমার বেভুল অবস্থা। এমন অযাচিত সান্ত্বনার তোড়ে আমার মাথা ব্যথা হয়ে গেলো। গ্রামের মানুষের সাথে নরম হয়ে কথা বলতে হয়। না হয় গ্রামে ছড়ায়ে দিবে, স্যারের পোলা একটা জন্মের খারাপ। আমি প্রায় বিশ মিনিট একই কথার রিপিটেশন শোনলাম। এরপর বাধ্য হয়ে বললাম, চাচি রাখি? তিনি কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন
- আহারে কষ্টে পোলাটা কথাও কইতে পারতেছেনা। রাখো বাবা রাখো...।
তারপরেও অন্তত মিনিট পাঁচেক কী কী যেন বললেন।
ঘটনা সবে শুরু। এরপর প্রতিদিন মিস কল। ব্যাক করলেই
- বাবা মনটা ভালা নি তোমার? মা নাই তো কী হইছে, আমরাই এখন তোমার মা ...
ইচ্ছা হয় বলি, আমার বাপরে গিয়া বলে আসেন, আপনার বউ নাই, আমিই আপনার বউ, যত্তসব। কিন্তু মুখে বলি
- জ্বী অবশ্যই চাচী, অবশ্যই।
ডেইলি এই মিসকল যন্ত্রনা চললো কয়েকদিন। এরপর যখন ব্যক করি না, তখন শুরু হইলো কল দেওয়া। কেটে ব্যাক করি। একই প‌্যাচাল। ঘটনা গিয়ে এমন অবস্থায় দাঁড়াইলো, মনেমনে বললাম - মা তুমি কেন মরে গেলা! না মরলে তো এই যন্ত্রনা আমার পোহাইতে হইতো না।
প্রতি দিনের এই যন্ত্রনা আর নিতে পারলাম না। দিন পনেরো পরে কল ধরা, ব্যাক করা সব বন্ধ করে দিলাম। তিরিশ চল্লিশবার যে কেউ কাউরে কল দিতে পারে, এই অভিজ্ঞতাটা আমার তখনই হইলো। একদিন ঝাড়ি দেওয়ার জন্যই ব্যক করলাম
- চাচী বলেন
তিনি আজ সান্ত্বনার উপর গেলেন না। সরাসরি বললেন
- তোমার বইনে তো পাশ করছে।
অপরিচিত বইন পাশ করায় তেমন আনন্দ পাইলাম না। বরং নিজের কাছেই খারাপ লাগলো। মনে হইলো, আহারে তারা আমারে এত আপন মনে করে একটা সুসংবাদ দেওয়ার জন্য ফোন দিচ্ছে, অথচ আমি ফোনটা ধরতেছি না।
পরের দিন আবার মিস কল। ব্যাক করলাম। আজকে আবার শুরু হইলো সান্ত্বনা বাণী। আমি আজ আর "জ্বী চাচী, জ্বী চাচী" বলার ধৈর্য পাইলাম নাই। বিষয়টা খুব একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে তা হয়ত তিনি টের পেলেন। তাই সোজা বক্তব্য চলে আসলেন
- তোমার বইনেরে তো ভর্তী করাবো। যেই টাকা লাগবো, এইটা তোমার কাছে হাতের ময়লা।
সাথে বইটই মিলায়ে দেখা গেলো আজকাল হাতের ময়লার দামও হাজার দশেকে গিয়ে ঠেকেছে।
শিক্ষায় পাশে দাঁড়াতে আমার কোন আপত্তি নাই। কিন্তু হীতে কতটা বিপরীত হবে তা ভেবেই আমি শংকিত। প্রায়ই ভাবি, সাহায্য সাধ্যমত করা দরকার। কিন্তু কিছুতেই যেন তারা টের না পায় বিষয়টার সাথে আমি জড়িত। মা মারা যাবার পর গ্রামেও যাওয়া হয় না, অমন সুযোগও করে উঠতে পারি না। তবে বিষয়টা মনে চেপে বসে আছে। শিক্ষায় পাশে দাঁড়ানো দরকার, অতি অবশ্যই দরকার...।

No comments:

Post a Comment